সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ঢাকার গাইনি ওয়ার্ডের ৩য় তলায় স্ত্রীকে রেখে আমি অজানা কারণে নিচতলার ক্যান্টিনে যাই। আবার কোন কারণ ছাড়াই নিচে ২-৩ মিনিট পায়চারী দিয়ে ৩য় তলায় ফিরে আসি। সময় তখন আনুমানিক সকাল ৯টা দিনটা ১৯ অক্টোবর ২০২১ সাল। ১জন লেফটেন্যান্ট কর্নেল, ১জন মেজর, ২জন এএফএনএস ও আরও কিছু নার্স (ডাক্তার সহ সবাই মহিলা) প্রবেশ করলেন অপারেশন থিয়েটারে। সমস্ত প্রস্তুতি শেষে সময় আনুমানিক ৯টা ২৫ এর দিকে ডাক আসল প্রসূতিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার। যথারীতি কয়েকজন নার্স এসে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো অপারেশন থিয়েটারে ততক্ষণে তার প্রসব বেদনা সহ্যের সীমা পেরিয়ে গিয়েছে।
সময় ৯টা ৩০ মিনিট যা হাত ঘড়িতে লক্ষ্য করলাম। শুরু হলো আমার কাউন্ট ডাউন। নিজেকে ক্ষণিকের মধ্যে অন্য জগতের মনে হয়েছে। কি করব, কি করা উচিত, কেন করা উচিত সবই ভুলে গেলাম। একবার ওয়েটিং রুম তো একবার থিয়েটারের সামনে এভাবে ১০ মিনিটের মধ্যে কয়েকবার চক্কর দিলাম। ওটির দিকে যদিও প্রবেশ নিষেধ কিন্তু নিজেকে সেই নিয়মের মধ্যে রাখতে পারছিলাম না আবার ভঙ্গও করতে পারছি না কারণ সেখানে প্রাইভেসির ব্যাপার আছে।
বড় আপু আমাকে বারবার শক্ত হতে বলছেন। বলছেন আল্লাহকে ডাকো, মনকে শক্ত কর। প্রসূতি মানসিকভাবে শক্ত আছে ইনশাআল্লাহ কোন সমস্যা হবে না। আমি নিজেকে ইস্পাতের মত শক্ত করি আবার মুহূর্তেই বরফের মত গলে যাই; নিজেকে ধরে রাখতে পারি না।
সময় ঠিক ৯টা ৪৪ ওটির ভিতর থেকে কান্না এবং খুশির আওয়াজ একসাথে আসছে কানে। একজন ডাক্তার বেরিয়ে এসে জানালেন আলহামদুলিল্লাহ কন্যা সন্তান হয়েছে এবং সন্তান ও প্রসূতি দুজনই সুস্থ আছেন। মনের অজান্তেই আমি কান্না করে দিয়েছি। বড় আপু আমাকে দেখে বিস্মিত হলেন। এর কিছুক্ষণ পর একজন নার্স সেই নতুন অতিথিকে নিয়ে আমার সামনে আসলেন। আমি কোলে নিলাম। আমার দুচোখ তখন ভেজা, ডাক্তার, নার্স ও আশেপাশের মানুষজন আমার দিকে তাকিয়ে। আমি কয়েক মুহূর্ত মেয়ের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। মনে হলো মেয়েও আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
নার্স বললেন দ্রুত তাকে শিশু ওয়ার্ডে নিয়ে যেতে হবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য। আমি কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম কেন কোনো সমস্যা? জবাবে তিনি মুচকি হেসে বললেন না কোনো সমস্যা নাই। এটা নরমালি চেক করা হয় বাচ্চার কোন সমস্যা আছে কিনা। নিজেই শিশু ওয়ার্ডে নিয়ে গেলাম; আমার সাথে ১জন নার্সও গেলেন।
শিশু ওয়ার্ডে মেয়েকে রেখে পাশেই বসে থাকলাম। প্রায় ৪০-৫০ মিনিট পর শিশু ওয়ার্ড থেকে এসে মেয়েকে নিয়ে গাইনি ওয়ার্ডে আসলাম। প্রথমবার একজন মা তার সদ্য ভূমিষ্ট কন্যা সন্তানকে দেখছেন। দুচোখ ভরা আনন্দ অশ্রু, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ❤️❤️
মেয়ে যখন কথা বলা শিখতে শুরু করল তখন তার প্রথম শব্দটিই ছিল "বাবা"। এ নিয়ে মেয়ের মায়ের সাথে প্রায়ই মধুর খুনসুটি হয়।
আলহামদুলিল্লাহ আজ ১৯ অক্টোবর ২০২৪। মেয়ের জন্মদিন। ৩ বছর অতিক্রম করে মেয়ে ৪ বছরে পদার্পণ করল। ছোট্ট মেয়ে আজ অনেক বড় হয়েছে। মেয়ের জন্য দোয়া প্রার্থী।
ভালবাসা অবিরাম
Diarir Kotha - ডায়েরির কথা
Comments
Post a Comment